শনিবার ১৫ মে ২০২১, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
◈ পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানালেন আওয়ামীলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ◈ ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রবীণ আ.লীগ নেতা রুস্তম আলী প্রামাণিক ◈ যশোর পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আজিজুল ইসলাম ◈ পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে কর্মহীন অসহায়ের মানুষের পাশে বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম ◈ তানোরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপকরণ বিতরণ। ◈ নওগাঁর মহাদেবপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদে কাঙ্খিত সেবা পেয়ে খুশি জনগণ ◈ নওগাঁয় অসহায় কৃষকের জমির ধান কেটে বাড়ি পৌছে দিলো কৃষকলীগ ◈ নওগাঁয় প্রভাবশালীরা জমি দখল করে বেড়া দিয়ে ঘিরে নেয়ায় ৮টি পরিবার অবরুদ্ধ ◈ রাজশাহীতে অশুভ শক্তি রুখে দেয়ার প্রত্যয় ◈ পঞ্চগড়ে কৃষকের মাঝে কম্বাইন হারভেষ্টার মেশিন বিতরণ

রানা প্লাজা ধসের সাত বছর আজ পোশাকশিল্পের আবার দুর্দিন

প্রকাশিত : ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, ২৪ এপ্রিল ২০২০ শুক্রবার ২০৫ বার পঠিত

দৈনিক সত্যের সন্ধান নিউজ ডেক্স, :

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর পোশাকশিল্পে দুর্দিন দেখা দেয়। ওই সময় সংকটে পড়ে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাকশিল্প। তবে কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে বৈশ্বিক ক্রেতাদের নানামুখী শর্ত পূরণ করে গত সাত বছরে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল পোশাক খাত। তবে এই ঘুরে দাঁড়ানো স্থায়ী হয়নি। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস পোশাক খাতকে আবারও অস্থির করে তুলেছে। বিদেশি বড় ক্রেতারা একের পর এক চাহিদা বাতিল ও স্থগিত করছেন।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার পর কারখানা বন্ধ ও লোকসানের অজুহাতে পোশাক খাতে এখন পর্যন্ত ২৫ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিক নেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনায় শ্রমিক নেতারা আরো অভিযোগ করেন, পোশাক খাতে এখনো যেসব শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ এক বছর হয়নি, তাঁদের মালিকদের পক্ষ থেকে ফোন করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। অনেক শ্রমিক এখনো মার্চ মাসের বেতন পাননি। তা ছাড়া অনেক কারখানার মালিক কারখানা লে-অফ করতে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদামতো নানামুখী শর্ত পালন করেছেন পোশাক কারখানার মালিকরা। কিন্তু নতুন করে সংকট তৈরি হলেও বৈশ্বিক ক্রেতারা পাশে নেই কেন। ওয়ালমার্ট, গ্যাপ, টার্গেট, মার্ক অ্যান্ড স্প্যাসারসহ বিশ্বের বড় বৈশ্বিক ক্রেতারা যেসব পণ্য বিশ্ববাজারে সরবরাহ করেন তার বড় অংশের জোগান দেন বাংলাদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিকরা।

এসব শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি দিয়ে ক্রেতারা তাঁদের পুঁজিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে অনেক বড় আকারে নিয়ে গেলেও শ্রমিকরা এখন কপর্দকশূন্য।

শ্রমিকদের বর্ণনা মতে, বেতন-ভাতা যথাসময়ে না পাওয়ায় অনেক রাতে তাঁদের ঘুমাতে যেতে হয় খালি পেটে। অথবা এক মুঠো মুড়ি বা চিঁড়া খেয়ে। তাই সবাই যখন করোনার সংক্রমণ থেকে নিজেদের সুরক্ষা দিতে নিরাপদ বাড়িতে অবস্থান করছেন, তখন গার্মেন্ট শ্রমিকরা করোনার ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন মজুরির দাবিতে। বাড়িওয়ালারা তাঁদের ঘর থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটে। ওই ভবন ধসে প্রায় ১১০০ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। এরপর গত সাত বছরে পোশাক খাতের কারখানা অবকাঠামো, কর্মপরিবেশ ও বৈদ্যুতিক সংস্কারসহ প্রায় আড়াই শ কোটি ডলার ব্যয় করেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। এর ফলে গত সাত বছরে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এ খাত। তবে করোনার কারণে আবারও ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়েছে পোশাক খাত।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, মার্চের বেতন দিতে পারেনি বেশ কিছু কারখানা। মূলত বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ায় এমন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দুই থেকে আড়াই শ কারখানা মালিক শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে ওই সব কারখানার শ্রমিকরা মাঠে নামছেন মজুরির দাবিতে। করোনা সংকটময় পরিস্থিতিতে পোশাক খাতের জন্য সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, কিন্তু এই টাকা কবে পাওয়া যাবে জানেন না ব্যবসায়ীরা।

তাঁরা আরো বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর গত সাত বছরে সামর্থ্য না থাকলেও ক্রেতাদের চাপে ব্যবসা ও শ্রমিক স্বার্থরক্ষায় কারখানা সংস্কার করা হয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন মালিকরা। অন্যদিকে ক্রেতারা পণ্যের এক টাকাও দাম বাড়াননি। এর মধ্যে করোনার প্রভাব ও ক্রেতারা উৎপাদিত পণ্য নিতে কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। অনেক ক্রেতাই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ক্রয়াদেশ বাতিল করছেন। ফলে তাঁদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্রেতাদের এমন আচরণে গত মার্চ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ৩০.১৯ শতাংশ। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এই তিন মাসে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার (৪.৯ বিলিয়ন ডলার) রপ্তানি আয় কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলেন, দুর্যোগের এই সময় শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার পাশে না দাঁড়িয়ে পেছন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন ক্রেতারা। এতে করে ৬৫ শতাংশ নারী পোশাক শ্রমিক, যাঁদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, তাঁরা মজুরি না পেয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ১৫৮টি ছোট কারখানার শ্রমিকরা বেতন না পাওয়ায় মাঠে নেমেছেন মজুরির দাবিতে। ক্রেতারা আদেশ বাতিল করায় এই মুহূর্তে পুরো পোশাক খাত ভয়ংকর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর পরিচালক টুমো পটিআইনেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের এই সংকটের সময় ব্র্যান্ড, উৎপাদক, সরকার, শিল্প ও এর শ্রমিক সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সংকট কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে আইএলও কাজ করছে। শুধু পোশাক খাতই নয়, সব খাতের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছি। আশার কথা, পোশাক খাতের কিছু ক্রেতা সম্প্রতি পাওনা দিয়ে তাঁদের তৈরি পোশাক নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদের এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার এই সংকট থেকে উত্তরণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বৈশ্বিক ক্রেতারাও এর দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। কার্যাদেশ বাতিল বা ডিসকাউন্ট সুবিধা চাওয়ার চেয়ে আমাদের শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার দায়িত্ব নিতে হবে যৌক্তিকভাবে।’ তিনি আরো বলেন, তাঁরা ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারেন না। বাংলাদেশের পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। পোশাকের মূল্য বেড়ে যাবে। বাংলাদেশেই কম দামে পোশাক সরবরাহ করতে হবে। এ ছাড়া এসব বৈশ্বিক ক্রেতারা আমাদের এই শ্রমিকদের দিয়ে বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেছেন বিশ্ব বাজার থেকে।

শ্রমিক নেতা আমিরুল হক আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্রেতাদের এই অন্যায় ও বেআইনি আচরণ বন্ধ হওয়া উচিত। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ক্রেতারা শ্রমিকপক্ষে যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আমরা চাই করোনা দুর্যোগের সময়ও তাঁরা পাশে থাকবেন। আমাদের উদ্যোক্তাদের প্রাপ্য পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।’ তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের ডেবেনহাম গ্রুপ দেশের চারটি কারখানা থেকে পণ্য নিলেও এখনো পাওনা পরিশোধ করছে না। এ ছাড়া এখনো অনেক উদ্যোক্তা পণ্য তৈরি হয়ে যাওয়ার শিপমেন্ট বাতিল করেছেন। কাটিং করা মাল স্থগিত করছেন। কেউ কেউ ডিসকাউন্ট সুবিধা চান। এটা মোটেও উচিত নয়। বেআইনি।’

বিজিএমইএ জানায়, এরই মধ্যে ক্রেতারা ৩১৫ কোটি ডলারের পণ্য ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করেছেন। এসব কারখানায় প্রায় ২২ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করে। বিজিএমইএ নেতারা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনা যেহেতু আমাদের দেশের অভ্যন্তরে ঘটেছে তাই এর প্রাথমিক দায়ভার আমাদেরই বহন করতে হয়েছে। সে সময় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তাঁদের ব্যবসায়িক সুনাম রক্ষাসহ নানাবিধ কারণে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছেন, তবে নিরাপত্তার বিষয়টিতে আমরাও যথেষ্ট সোচ্চার হয়েছিলাম, তা না হলে নিজস্ব অর্থায়নে আড়াই শ কোটি ডলার (২.৫ বিলিয়ন) খরচ করে এত বড় একটি শিল্পে এত অল্প সময়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির যে নিদর্শন সৃষ্টি হয়েছে তা নজিরবিহীন।’

বিজিএমইএ সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি কালের কণ্ঠকে বলেন, এপ্রিল মাস যেন পোশাক খাতের দুর্যোগের মাসে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে প্রায় ১১০০ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক কষ্টে এ খাতের উদ্যোক্তারা ঘুরে দাঁড়ালেও গত সাত বছর পর এই সময় করোনার আঘাতে আবারো ক্ষতবিক্ষত। তিনি বলেন, এ সময় তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, বেসরকারি সংস্থা এবং সরকার ও মালিক মিলে সম্মিলিত উদ্যোগ না নিলে দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন পুরো ঝুঁকিতে পড়বে। তৈরি পোশাক খাতের ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইনি বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ ও আইএলওর সাবেক কর্মকর্তা ড. উত্তম কুমার দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্রেতারা অর্ডার মতো দাম পরিশোধ করছেন না, তখন দেখা দরকার ক্রেতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী কারখানার চুক্তির বিষয়বস্তু কী। এমন বৈরী পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের চুক্তিগত ও আইনগত দায় কী? কোন দেশের আইনে উদ্ভূত বিরোধের নিষ্পত্তি হবে। উৎপাদনকারীরা ক্রেতাদের মানবিক দায় নিয়ে কথা বললেও এবং তা নিয়ে আবেদন-নিবেদন করা হলেও চুক্তিতে কী আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলছেন না। উৎপাদনকারীদের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট চুক্তি পর্যবেক্ষণ করা, ক্রেতারা চুক্তিগত বা আইনগত দায় এড়িয়ে গেলে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক সত্যের সন্ধান'কে জানাতে ই-মেইল করুন- sattersandhan24@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক সত্যের সন্ধান'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক সত্যের সন্ধান | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, Design and Developed by- DONET IT